বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১

শিরোনাম

‘ক্রিস্টাল আইস’ বিক্রি করেই জিরো থেকে হীরু শফিআলম


প্রকাশের সময় :২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ৭:৩৫ : অপরাহ্ণ

কোটি টাকার বাড়িটি ঘিরে বিগত তিনদিন ধরে বাঁশখালীর ছনুয়াবাসীর মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল। গৃহকর্তার উত্থান ও বাড়িটি নির্মাণে আয়ের উৎস নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ। কারণ, গত ২৫ ফেব্রূয়ারি এই বাড়ির মালিক শফি আলমসহ দুইজন নতুন ধরণের মাদক ‘ক্রিস্টাল আইস’সহ র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েছে। বাঁশখালীর উপকূলীয় ইউনিয়ন ছনুয়া এমন দূর্গম জনপদের একটি গ্রামে বিশালবহুল বাড়িটি শফি আলমের।  গ্রামের কবির সিকদার পাড়ার বিস্তীর্ণ লবণ মাঠের মাঝখানে সীমানা প্রাচীর ঘেরা সুরম্য একটি বাড়ি। অনেকদামি এই মাদকটি সারাদেশে তৃতীয় বার ধরা পড়লেও চট্টগ্রামে প্রথমবার। ক্রিস্টাল আইস চট্টগ্রামে আনার পেছনে শফি আলমের বিদেশি লিঙ্ক কাজ করেছে বলেই ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
র‌্যাব-৭ এর উপ-পরিচালক মেজর মুশফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, গ্রেপ্তারকৃত শফিউল আলম করোনার লকডাউন শুরুর আগে আফ্রিকার মোজাম্বিক থেকে দেশে ফিরে। এই মাদক সাধারণত আফ্রিকা কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে পাওয়া যায়। শফিউল যেহেতু আফ্রিকায় ছিলেন সেই সূত্র ধরেই তদন্ত শুরু করেছি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাঁশখালীর ছোট ছনুয়া এলাকার কবির আহমদ সিকদার পাড়ার মোজাফ্ফর আহমদের ছেলে শফি আলম ও মো. ইসমাইল। ছনুয়ার সাবেক এক চেয়ারম্যানের বাড়িঘর দেখভাল করায় ওই চেয়ারম্যানের ঘনিষ্টজন ছিলেন মোজাফ্ফর। ২০১২ সালে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রাক্কালে ওই চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে থেকে ১১৪ জনকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পরই জানাজানি হয় বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকাটি মানব পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেসময় শফি আলম ও তার ভাই ইসমাইলের নেতৃত্বে এই মানব পাচারের এই চেষ্টা হয়েছিল বলে এলাকায় খবর রটে।
২০১৯ সালে মালয়েশিয়া পাচারের প্রাক্কালে স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল আবছারের সহায়তায় শফি আলমের বাড়ি থেকে ১৭ জন নারীসহ ২০ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে এলাকাবাসী। এ ঘটনায় বাঁশখালী থানায় দায়ের করা মামলায় শফি আলমকে আসামি করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে শফি আলম আত্মগোপনে চলে যায়। অনেকের মতে, শফি আলম আফ্রিকা কিংবা মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। করোনার লকডাউন শুরুর আগে শফি আবার এলাকায় ফিরে এসে শুরু করেন আলিশান বাড়ির কাজ। গত ছয় মাস আগে লবণ মাঠের মাঝখানে নির্মাণ করেন সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সুরম্য বাড়ি। স্থানীয়দের ধারণা, মানব পাচার ও মাদক বিক্রির টাকায় তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেছেন।
এরমধ্যে গত বছরের ২০ নভেম্বর শালিসী বৈঠক শেষে বাড়ি ফেরার পথে ইউপি সদস্য নুরুল আবছারের পথরোধ করে চাঁদা দাবি করেন। এ ঘটনায় নুরুল আবছার বাদী হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বাঁশখালী থানা পুলিশকে তদন্ত করার আদেশ দেয় আদালত। গত ১৭ ফেব্রুয়ারী বাঁশখালী থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এ ঘটনার সত্যতা পেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে দুই লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি এবং শফি ও ইসমাইল দুই ভাই যে চিহ্নিত মাদক পাচারকারি তাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এর আগে গত বছরের ২১ অক্টোবর ছনুয়া ইউনিয়ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভায় শফির বিরুদ্ধে রেজুলেশন করেন চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশিদ।
বাঁশখালী থানার উপ-পরিদর্শক দীপক সিংহ বলেন, ‘আমি একটি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে বুঝেছি শফি একজন চিহ্নিত মানব পাচারকারী ও মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা আছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেছিলাম কয়েকবার। এখন শুনেছি মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছে’।
ছনুয়া ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আবছার বলেন, ‘মানব পাচার করার প্রাক্কালে হাতেনাতে ২০ জনকে উদ্ধার করে আমি তার রোষানলে পড়েছি। এলাকায় যেতে পর্যন্ত আমাকে বাধা দিয়েছে। শফি ও তার ভাই ইসমাইল এলাকায় মানব পাচারকারী হিসেবে পরিচিত। এখন শুনছি নতুন এক মাদক নিয়ে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েছে। মূলত মানব পাচারে এলাকাবাসী ও পুলিশের চাপের মুখে ব্যর্থ হয়ে সে মাদক ব্যবসায় ঝুঁকেছে। আফ্রিকা কিংবা মালয়েশিয়ায় একটি চক্রের সাথে তার লিঙ্ক রয়েছে। তদন্ত করলেই তার উত্থানের আসল রহস্য বের হবে’।
সূত্র জানায়, ২৫ ফেব্রূয়ারি খুলশী থানার মোজাফ্ফর নগর বাই লেন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৪০ গ্রাম ক্রিস্টাল আইসসহ ইয়াসিন রানা ও শফিউল আলমকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। উদ্ধারকৃত মাদকের আনুমানিক মূল্য ১৪ লক্ষ টাকা। ক্রিস্টাল আইস মাদকটি ইয়াবার চেয়ে শক্তিশালী। ইয়াবা শরীরে প্রবেশের পর যতটুকু হরমোনজনিত উত্তেজনা তৈরি করে তার চেয়ে ৫০-৬০ গুণ বেশি উত্তেজনা তৈরিতে সক্ষম ক্রিস্টাল আইস। ইয়াবায় এমফিটামিন থাকে পাঁচ ভাগ, আর ক্রিস্টাল আইসের পুরোটাই এমফিটামিন। এটি বেশি সেবন করলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
ছনুয়ার ছেলবন এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ‘শফি আলম কাউকে পরোয়া করতো না। মানব পাচারকারী হিসেবে তাকে সবাই চিনতো। এবার নতুন মাদক নিয়ে ধরা পড়ায় এলাকাবাসী বুঝেছে তার আয়ের প্রধান উৎস মাদক বিক্রি। সরকার ইদানিং মানব পাচারে কড়াকড়ি আরোপ করায় মাদক বিক্রিতেই ঝুঁকেছেন শফি। তার ভাই ইসমাইল এখনো এলাকায় আছে বলেও জানান তিনি।

ট্যাগ :